০৮ মে ২০২৬
অভিবাসন এখন একটি স্বীকৃত মানবাধিকার। উন্নত জীবন ও জীবিকার আশায় মানুষ বিদেশে পাড়ি জমায়। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন—অভিবাসীদের ওপর নিপীড়ন, প্রতারণা ও হয়রানির ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। এই লেখায় একজন বাংলাদেশি অভিবাসীর জীবনের এমনই এক বাস্তব ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
আমি একজন প্রবাস ফেরত অভিবাসী কর্মী, যিনি মানবপাচারের শিকার হয়েছিলাম। বর্তমানে আমি অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, ২০০৭ সাল ছিল বাংলাদেশের অভিবাসন ইতিহাসে এক বেদনাময় অধ্যায়। সে সময় কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি বিদেশে পাঠানোর নামে ৮০ জন বাংলাদেশি কর্মীকে পাচার করে। আমি তাদেরই একজন—একজন দুর্ভাগা মানুষ, যিনি সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত।
একজন অভিবাসীর কাহিনী: জয়নাল আবেদিন জয়
স্বপ্ন নিয়ে ২০০৭ সালে গোল্ডেন অ্যারো লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যাই। কিন্তু সেই স্বপ্ন খুব দ্রুতই ভেঙে যায় প্রতিষ্ঠানের প্রতারণায়। কুয়ালালামপুরে পৌঁছেই বুঝতে পারি—আমি প্রতারিত হয়েছি।
আমার নাম জয়নাল আবেদিন জয় (জন্ম: ১১ অক্টোবর ১৯৮২)। পিতা—মো. তাসির উদ্দিন মন্ডল, মাতা—মোস. আসিয়া বিবি। বাড়ি নওগাঁ জেলার মান্দা থানার ভদ্রসেনা গ্রামে। আমরা চার ভাই, আমি সবার ছোট। পরিবারের সবার আদরে বড় হয়েছি। ১৯৯৮ সালে গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে রাজশাহীর নিউ গণত ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হই।
পড়ালেখার পাশাপাশি কম্পিউটার কোর্স করি এবং রাজশাহী কারাতে–দো–অ্যাকাডেমির সঙ্গেও যুক্ত ছিলাম। পরে ব্যবসার জন্য বাবার কাছে টাকা চাইলে তিনি রাজি হননি। এতে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে পড়ি—নিজেকে স্বনির্ভর করার সংকল্প নিয়ে।
বন্ধু মেহেদির সঙ্গে মান্দার প্রসাদপুর বাজারে ‘মেগা সফট কম্পিউটার’ নামে একটি ট্রেনিং সেন্টার শুরু করি। কিন্তু আয় কম হওয়ায় তা চালিয়ে যেতে পারিনি। পরে বাবার সহায়তায় ঢাকায় ডিজিটাল ফটোগ্রাফির কোর্স করি এবং ‘ফ্লোরা লিমিটেড’-এ ভর্তি হই। এরপর ইউনিলিভারের একটি ডিস্ট্রিবিউশন প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করি এবং আইটি বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করি।
মালয়েশিয়ার বিভীষিকা:
এক পর্যায়ে রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি মালয়েশিয়ায় চাকরির প্রস্তাব দেন। বলা হয়েছিল, আমি কম্পিউটার রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করবো। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—একজন ক্লিনারের কাজ।
আমার বাবা ছয় বিঘা জমি বিক্রি করে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা জোগাড় করেন। সেই অর্থ দিয়ে আমি মালয়েশিয়া যাই। ২০০৭ সালের ১ মার্চ, আমি সহ ১২৮ জন প্রবাসী সেখানে পৌঁছাই। কিন্তু কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে আমাদের গ্রহণ করার মতো কেউ ছিল না। তিনদিন অনাহারে থাকার পর পুলিশ আমাদের উদ্ধার করে একটি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে।
সেখানে আমাদের বিভিন্ন দলে ভাগ করা হয়। আমাকে একটি রেস্টুরেন্টে কাজ দেওয়া হয়—ময়লা পরিষ্কার করা, দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ, কিন্তু কোনো বেতন নেই। খাবারের অভাবে আমরা বাসনপত্র বিক্রি করে খেয়েছি। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়লেও চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সেই সময় আমরা একে অপরকে সহায়তা করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছি।
প্রতিবাদ ও আন্দোলন:
অবশেষে আমরা ১৪৪ জন বাংলাদেশি একত্রিত হয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনে অভিযোগ দিই। সেখান থেকেই শুরু হয় আমাদের আন্দোলন। আমরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরি। কিন্তু এর ফলে আমাদের ওপর আরও নির্যাতন নেমে আসে—পুলিশি হয়রানি, স্থানান্তর, অনাহার, আশ্রয়হীনতা—সবকিছু সহ্য করেও আমরা থামিনি।
এক পর্যায়ে আমরা একটি গির্জায় আশ্রয় নিই। গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের পর বাংলাদেশ সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু দেশে ফিরে আসার পরও আমরা আমাদের প্রাপ্য পুরো অর্থ পাইনি। তখন আবারও আমরা আন্দোলনে নামি—মন্ত্রণালয়, সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সহায়তায়।
পরবর্তীতে আমরা ‘ইমা রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ গঠন করি, যেখানে আমি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। আমাদের কাজকে সমর্থন দেয় বিএমডিএফ, অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়ার টানাগানিতা সংগঠন।
শেষ কথা
জীবনের এই কঠিন অভিজ্ঞতা শুধু আমার একার নয়—এটি হাজারো অভিবাসীর বাস্তবতা। এই পথচলা থেকে আমরা শিখেছি, অধিকার আদায় করতে হলে সংগ্রাম ছাড়া উপায় নেই।
আমি আজও বিশ্বাস করি—অভিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব, যদি আমরা একসাথে দাঁড়াই। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি এই লড়াই চালিয়ে যেতে চাই। আপনাদের সহযোগিতা ও সমর্থনই আমাদের শক্তি।
০৩ মে ২০২৬